আই ও টি (IoT)  কথাটির পূর্ণ নাম হচ্ছে ইন্টারনেট অব থিংস (Internet of Things) অবাক হচ্ছেন তাই না? ভাবছেন এটা আবার কি জিনিস? খায় না মাথায় দেয়  😛  আই ও টি খায় না মাথায় দেয় সেটা নিয়েই আমাদের আজকের এই আলোচনা। অনেকেই হয়তো ইতোমধ্যেই আই ও টি সম্পর্কে জেনে গিয়েছেন। আবার এমন অনেকেই আছেন যারা আরেকটু এডভান্স লেভেল এ গিয়ে এই জিনিস নিয়ে অনেক কাজ ও করেছেন। যারা আই ও টি নিয়ে একেবারেই কিছু জানেন না, তাদের জন্য এই লেখাটি। প্রথমেই কিছু প্রাথমিক আলোচনা হয়ে যাক।

আই ও টি কি? 

আই ও টি হলো এমন একটা নেটওয়ার্ক  যেখানে ভৌত জিনিসিপত্র, যেমন: যানবাহন, গৃহস্থালির জিনিসিপত্র,  কৃষি কাজের যন্ত্রপাতি, ইত্যাদি একটা সিস্টেমের মধ্যেই  থাকে। তৎক্ষনাৎ আপনার মাথায় চিন্তা আসতেই পারে যে তাহলে কয়টা বাস আর কয়টা ফ্যান লাইট একত্রে রাখলেই সেটা হয়ে যাবে আই ও টি! না। আপনি যা ভাবছেন তা নয়। শুধু মাত্র একত্রে থাকলেই হবে না। জিনিসগুলো বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস,  সফটওয়ার ও ইন্টারনেটের এর মাধ্যমে সংযুক্ত থাকবে এবং একটা বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে তথ্য আদান-প্রদান হবে।

আপনার সরল মনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি নাড়া দিতে পারে, তা হচ্ছে এই আই ও টি শিখে আপনার কি লাভ! সুতরাং বিষয়টা যখন লাভ-ক্ষতির, তাই আমরা প্রথমেই কয়েকটি দৃশ্যপট নিয়ে আলোচনা করবো।

দৃশ্যপট ১ :  ধরুন দুই ছেলে-মেয়ে,স্ত্রী আর বৃদ্ধ মা বা কে নিয়ে আপনার সংসার। আপনি আর আপনার স্ত্রী দুইজনই কর্মজীবী। স্বভাবতই দুজন সারাদিন সারাসপ্তাহ খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই অনেক সময় সাংসারিক ছোটখাটো কিছু কাজে ভুল হয়ে যায় অথবা আপনারা ভুলে যান। যেমন, শুক্রবারে সাপ্তাহিক বাজারের লিস্টে আপনার স্ত্রী আপনাকে টমেটোর কথা বলতে ভুলে গিয়েছেন। কিংবা ঘরে আগে থেকেই পর্যাপ্ত আলু থাকা সত্ত্বেও আপনি ভুল করে আরো আলু নিয়ে এসেছেন। আপনার বাবার ডায়াবেটিকস এর ইনস্যুলিন আনার কথা মনে নেই আপনার। আপনার ছোট মেয়েটা ফ্রিজ খুলে চকলেট নিয়ে দরজা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে। ব্যস, খেলো মায়ের হাতের ধরাম ধরাম মাইর। ভাবুন তো, যদি এমন হতো, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিনা শ্রমে আপনি জেনে যেতেন যে ঘরে কি কি বাজার আছে। কার কি কি ঔষধ লাগবে। অথবা ফ্রিজের দরজা, বাথরুমের কল খোলা থাকলে আপনি নিমিষেই নোটিফিকেশন পেয়ে যেতেন। কি! স্বপ্ন মনে হচ্ছে তাই তো? প্রযুক্তির এই যুগে দাড়িয়ে এটা এখন আর স্বপ্ন নয় বরং সত্যি! এই সবই আপনি পেতে পারেন আই ও টি র কল্যাণে!

দৃশ্যপট ২:  একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে আমরা সবাই স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ, স্মার্টব্যান্ড আরো অনেক স্মার্ট ডিভাসের কথা শুনেছি। আচ্ছা,ভাবুন তো, আপনি যেই শহরে থাকেন, সেই গোটা শহরটাই যদি হয়ে যায় স্মার্ট সিটি! আরেকটা খোলাসা করে বলি ব্যাপারটা। কল্পনা করুন এমন একটা শহরে আপনি থাকেন যেখানে দিনের আলো না থাকলেই অটোম্যাটিকেলি শহরের রাস্তায় লাইট অন হয়ে যাবে। ধরুন আপনি সকাল্র ৮ টায় অফিসের জন্য রওনা হন। একদিন সকালে GPS এর মাধ্যমে আপনি জেনে গেলেন যে আপনি যে রুটে যাতায়াত করেন সেখানে জ্যাম আর তার সাথে এটাও জেনে গেলেন যে অন্য কোন রাস্তা ধরে আপনি দ্রুত অফিসে পৌছাতে পারেন। ভাবুন তো এমন একটা শহর যেখানে নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা না ফেললে সাথে সাথে নোটিফিকেশন এর মাধ্যমে আপনাকে সতর্ক করে দেয়া হবে। ধরুণ, কোনো একটা রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়েছে। কয়েক মুহূর্তেই পুলিশ, ফায়ারসার্ভিস  এম্বুল্যান্স সব হাজির অথচ তাদের ফোন করে করে ডেকে আনা হয়নি, এসেছেন নিজের গরজে! কি ভাবছেন?? এ তো অসম্ভব! না! আই ও টি র খাতিরে এইসব কিছুই সম্ভব

দৃশ্যপট ৩: আপনি একজন শৌখিন মানুষ। বারান্দায় ফুলের গাছ লাগানো,  নিজের উঠোনে সবজি চাষ করার আপনার খুব শখ। কিন্ত ব্যস্ততার জন্য এইসব কিছুই হয়না! যত্ন করবে কে? তাহলে কি আপনার শখের জিনিসগুলো আর হবে না? নিশ্চই হবে! আপনার জন্য আছে আটো ইরিগেশন সিস্টেম যেখানে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস, সফটওয়ার এরাই বুঝবে কখন আপনার শখের ফুল গাছের পানি দরকার, কখন দরকার সার। কি মজার না ব্যাপারগুলো! আই ও টি কে ব্যবহার করে এরকম আরো অনেক মজার মজার কাজ করা যায়। সেগুলো নিয়ে আমরা একটু পরে আলোচনা করবো।

তো আমরা মোটামুটি বুঝে গেলাম আই ও টি আমাদের জীবনে কি ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। এবার নিশ্চইয় জানতে ইচ্ছে করছে কি এমন আলাদিনের চেরাগ আছে এতে, যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এত কাজ করে ফেলছে! তাহলে চলুন এবার আই ও টি নিয়ে গুরুগম্ভীর কিছু কথা বার্তা জেনে আসি।

যেভাবে কাজ করে

IoT কে কখনো IoE (ইন্টারনেট অফ এভরিথিং)  ও বলা হয়। এটা আসলে এমন কিছু ওয়েব-এনএবলেড ডিভাইস এর সমন্বয়ে গঠিত যারা এমবেডেড সেন্সর,প্রসেসর ও কমিউনিকেশন হার্ডওয়ার ব্যাবহার করে আশপাশ থেকে তথ্য গ্রহণ করে এবং এক ডিভাইস থেকে আরেক ডিভাইসে পাঠায়। এদের Connected অথবা Smart Device বলে।  মানুষ চাইলে নিজের পছন্দ ও সুবিধামতো তাতে ডাটা এন্ট্রি করতে পারে সেট আপ দিতে পারে। আসুন IoT র কর্মপদ্ধতি একটূ নিজ চোখে দেখে নেই। নিচের ভিভিও খুব সুন্দর করে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বুঝার সুবিধার্থে না লিখে ভিডিওর মাধ্যমে ভিজুয়ালাইজ করে দিচ্ছি,

তো আইওটি আলোচনা করার পর অনেকের হয়তো জানতে ইচ্ছে করছে এই আইওটির ভবিষৎ কি। অথবা টেক বিশ্বে এর প্রভাব কতটুকো! তাহলে আসুন ছোট্ট করে একটু জেনে আসি!

বিষেশজ্ঞদের হিসেব মতে, আগামী ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ বিলিয়ন অবজেক্ট আইওটি’র অন্তর্ভুক্ত হবে। আইওটি’র অগ্রগতি নিয়ে HP একটা ছোট্ট জরিপ করে। সেই জরিপের তথ্যানুযায়ী আমরা জানতে পারে কিভাবে প্রতিবছর চমকপ্রদভাবে আই ও টি র ব্যবহার বেড়েই চলেছে।

ছবিঃ IOT নিয়ে HP’র সমীক্ষা

KRC Research যুক্তরাজ্য ,যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও জার্মানিতে স্মার্ট এপাইলন্সের ব্যবহার নিয়ে একটা জরিপ করে। সেই জরিপের ফলাফল নিচের ছবিটা

আচ্ছা, এতো কিছু তো জানলাম আইওটি নিয়ে। এবার নিশ্চই আপনার মনে আগ্রহ উঁকিঝুঁকি মারছে, এই জিনিস এর শুরুটা কিভাবে? চলুন তাহলে আপনার কৌতুহল মেটানোর জন্য একটু পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে আসি।

আইওটি ‘র ইতিহাস

স্মার্ট ডিভাইস নিয়ে এই কনসেপ্ট খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৮২ সালের শুরুর দিকে প্রথম এই বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু হয়।  Carnegie Mellon Univerity ‘র মোডিফাইড কোক মেশিন ছিলো সর্বপ্রথম ইন্টারনেট কানেকটেড ডিভাইস। এই যন্ত্রের ফিচারগুলো ছিলো এরকম যে, এটি কোনো একটা কোল্ড ড্রিংক এর উপাদানের পার্সেন্টটিজ সম্পর্কে কাস্টমার কে অবগত করতে পারতো আর সেটি কাঙ্খিত লেভেল এর ঠান্ডা কি না তাও নির্ণয় করতে পারতো। ১৯৯১ সালে মার্ক উইসারের একটা পেপার প্রকাশিত হয়। সেখানে “Ubiquitous Computing“, “The computer of the 21st Century ”  এছাড়াও কিছু একাডেমিক ভেন্যু যেমন “Ubicomp” এবং “Percom” নামের কিছু বিষয় আলোচিত হয় যার মধ্যে আইওটি নিয়ে একটা সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। ১৯৯৪ সালের ঘটনা। IEEE spectrum এ রেজা রাজি আইওটি ব্যাপারটা কে এইভাবে তুলে ধরেন যে,

” একটা প্যাকেট অফ ডাটা  যাকে বড় কোনো নোডে এপ্লাই করে গৃহস্থালি জিনিসপত্র থেকে শুরু করে যাবতীয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনগুলোকেও অটোম্যাট করে”

১৯৯৯ সালে বিল জয় তার সিক্স ওয়েব ফ্রেমওয়ার্ক এর অংশ হিসেবে ডিভাইস টু ডিভাইস (D2D) কমিউনিকেশন এর কথা কল্পনা করেন এবং তার এই ধারণা  World Economic Forum এ প্রস্তাব করেন। ঐ বছরই MIT ‘র Auto -ID Centre এবং এর সাথে সম্পর্কিত মার্কেট এনালাইসিস পাবলিকেশন এর সুবাদে আই ও টি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। Auto-ID Centre এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কেভিন এজথ কে Radio Frequency Identification (RFID) নিয়ে অবগত করা হয়। তার পছন্দানুযায়ী এই পুরো ব্যাপারটার নামকরণ করা হয় ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT)

আর্টিকেলের প্রথমে আমরা ৩টি দৃশ্যপট থেকে আইওটির কিছু ব্যবহার জেনেছিলাম। এছাড়াও আইওটির রয়েছে আরো বহুমুখী অ্যাপ্লিকেশন। তো চলুন এবার একনজরে এর চমৎকার কিছু এপ্লিকেশন দেখে আসি।

স্মার্ট হোম: আইওটি সম্পর্কিত যেইসব ফিচারগুলো নিয়ে গুগলে সব থেকে বেশি খোঁজাখুঁজি করা হয়, তারমধ্যে সর্বপ্রথম হচ্ছে স্মার্ট হোম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে স্মার্ট হোম কি?

চলুন একটু ফ্ল্যাশ ব্যাক এ যাওয়া যাক। মনে আছে আর্টিকেল এর শুরুর দিকের সেই দৃশ্যটির কথা, যেখানে নিজে থেকেই একটা বাড়ির সমস্ত কিছুর খবরাখবর থাকে হাতের মুঠোয়। এটাই আসলে স্মার্ট হোম। অর্থাৎ কম সময়ে, কম পরিশ্রমে একটা বাড়িকে সম্পূর্ন নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা। ব্যাপারটা আরো সুন্দর করে বুঝতে চাইলে নিচের ভিডিও টি দেখে আসুন।

স্মার্ট সিটি : স্মার্ট সিটি কি সেটা নিয়ে আগেই বলা হয়েছে। বিষয়টা কে আরেকটু ভালো ভাবে ভিজ্যুয়ালাইজ করতে চাইলে নিচের ভিডিও টা আপনার জন্য

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট : ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরে নতুন গুঞ্জন শুরু হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট নিয়ে। একে আবার এক নতুন নাম দেয়া হয়েছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অফ থিংস (IIoT)। এটা নতুন নতুন সব সেন্সর, সফটওয়ার, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ও বিগ ডাটা এনালাইসিস এর মাধ্যেম নতুন নতুন সব মেশিন তৈরীতে কোম্পানীগুলোকে উদ্ধুদ্ধ করছে। GE Electric এর সিইও জেফ ইম্মেল্ট এর মতে, IIoT একটা খুব সুন্দর, অতি প্রত্যাশিত ও বিনিয়োগ যোগ্য একটা জায়গা। IIoT’ র সুবাদে আজকাল এমন কিছু স্মার্ট মেশিন তৈরী হয়েছে যা কি না একটা কোম্পানীর বাৎসরিক আয়-ব্যয়,লাভ -লোকসান, এইসব কিছুর হিসাব মানুষের চেয়েও দ্রুত এবং নির্ভুল ভাবে বের করতে পারে।IIoT. র কাজ আর স্পষ্টভাবে বুঝতে চাইলে দেখে নিন এই ভিডিওটি

পরিধাণযোগ্য ডিভাইস :  এই জিনিসটার বর্তমানে সারা বিশ্ব জূড়ে বেশ চাহিদা। তাই তো গুগল, স্যামসাং এর মতো নামজাদা কিছু কোম্পানী এর পিছনে বিনিয়োগ করছে।  কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শরীরের সাথে কিছু ডিভাইস যুক্ত করে আমরা কি সুবিধাটা পাচ্ছি?  আচ্ছা, আর না ঘাটাই! চলুন দেখে আসি ভিডিও টা।

কি ভাবছেন? আসলে এই ডিভাইসগুলো এমন কিছু সেন্সর আর সফট ওয়ার এর কারসাজি যেগুলো কি না ইউজার সংক্রান্ত ডাটা কালেক্ট করে এবং সেগুলোকে প্রসেস করে আউটপুট দেখায়।

সেই আগুন আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু। পথ চলতে চলতে আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এমন এক ধাপে এসেছে পৌছেছে যেখানে কি না পৃথিবী হাতের মুঠোয় নয়, বরং আঙ্গুলের ডগায় এসে গিয়েছে। সাধারণ কোক মেশিন দিয়ে শুরু হওয়া আইওটি আজ মানুষের জীবন্যাত্রা সহজ থেকে সহজতর করে তুলেছে। আজ এই পর্যন্তই আইওটি নিয়ে আরেক টি পর্ব লেখার ইচ্ছা ব্যাক্ত করে এখানেই শেষ করছি 🙂