ট্রান্সফরমার কিঃ

সহজ কথায় বলা যায়, এমন একটি ইলেক্ট্রনিক/ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্র যেটি ইনপুট হিসেবে ইলেক্ট্রিক পাওয়ার নিয়ে আউটপুটেও ইলেকট্রিক পাওয়ার দিবে, কিন্তু এদের মধ্যে কোন তারের সংযোগ থাকবে না।

কিন্তু, তাত্ত্বিক ভাবে বলতে গেলে বলতে হবে, ”ট্রান্সফরমার এমন একটি স্থির যন্ত্র বিশেষ যেখানে কারেন্টের সাপেক্ষে, এসি সাপ্লাই এর ভোল্টেজ বাড়ানো হয় নয়ত কমানো হয়

ইংরেজি শব্দ ট্রান্সফরম (Transform) থেকে ট্রান্সফরমার (transformer) নামটি উদ্ভুত। যার বাংলা অর্থ কোন কিছুকে ট্রান্সফরম বা রূপান্তর করা। আমাদের দৈনন্দিন দেখা ট্রান্সফরমার সমূহ ভোল্টেজ ও কারেন্ট কে ট্রান্সফরম করে ব্যবহার উপযোগী করে বিধায় এটির নাম এমন দেয়া হয়েছে।

 

প্রকারভেদঃ

কোর এর আকার, ব্যবহার ও কাজের প্রকারভেদে অনেক ধরণের পাওয়ার ট্রান্সফরমার রয়েছে। যেমন,

  • ল্যামিনেটেড (E-I) কোর,
  • টরোয়ডাল কোর,
  • অটো ট্রান্সফরমার,
  • ভেরিয়েবল ট্রান্সফরমার।
  • এছাড়াও রয়েছে উচ্চ ফ্রিকুয়েন্সি ফেরাইট কোর ট্রান্সফরমার।

ফেরাইট কোর সাধারণত SMPS ও ডিসি টু ডিসি কনভার্টারে বহুল ব্যবহৃত হয়।

পাওয়ার টান্সফরমার ছাড়াও আরো অনেক রকম ট্রান্সফরমার রয়েছে। যেমন

  • কারেন্ট ট্রান্সফরমার
  • ইন্সট্রুমেন্ট ট্রান্সফরমার,
  • পালস ট্রান্সফরমার,
  • আরএফ ট্রান্সফরমার,

গঠনঃ

ট্রান্সফর্মারে মূলত দুটি অংশ থাকে:

  1. প্রাইমারি কয়েল বা মুখ্য কুণ্ডলী: এই কয়েলে এ.সি. বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
  2. সেকেন্ডারি কয়েল বা গৌণ কুণ্ডলী: এই কয়েলে বিদ্যুৎ শক্তি স্থানান্তর হয়।

একটি কাচা লোহার আয়তাকার মজ্জা বা কোর-এর দুই বিপরীত বাহুতে তার পেঁচিয়ে ট্রান্সফরমার তৈরি করা যায়। কোরের যে বাহুতে পরিবর্তী প্রবাহ বা বিভব (এ.সি.) প্রয়োগ করা হয় তাকে মুখ্য কুণ্ডলী বলে। আর যে কুণ্ডলীতে পরিবর্তী বিভব আবিষ্ট হয় তাকে গৌণ কুণ্ডলী বলে। স্টেপ-আপ (উচ্চধাপী) ট্রান্সফর্মারে প্রাইমারি কয়েলের চেয়ে সেকেন্ডারি কয়েলের পাক সংখ্যা বেশি থাকে। আর স্টেপ-ডাউন (নিম্নধাপী) ট্রান্সফর্মারে প্রাইমারি কয়েলের চেয়ে সেকেন্ডারি কয়েলের পাক সংখ্যা কম থাকে

 

ট্রান্সফরমারের বিভিন্ন অংশঃ

উইন্ডিং (Winding): ট্রান্সফরমারের উইন্ডিংয়ে দুই বা ততোধিক কয়েল থাকতে পারে। এই কয়েল সমূহ সাধারণত সুপার এনামেল তামার তারের হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট আকৃতির ফরমায় তৈরী কয়েলসমূহ একটি কোরের উপর বসানো হয়। প্রাইমারী উইন্ডিং এবং সেকেন্ডারী উইন্ডিংয়ের প্যাঁচের সংখ্যা ও সাইজ সমান হয় না। কারণ এই প্যাঁচের মাধ্যমেই আমরা কাংখিত ভোল্টেজ ও কারেন্ট পেয়ে থাকি।

 

কোর (Core): উইন্ডিংগুলো যে ইস্পাতের ফ্রেমের উপর জড়ানো থাকে তাকেই কোর বলা হয়। ইস্পাতের কোর ব্যবহারের ফলে প্রাইমারীতে উৎপন্ন ম্যাগনেটিক ফ্লাক্স অনায়াসে সেকেন্ডারীর সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে। কোর ব্যবহারের ফলে কোর লসের উদ্ভব হয়। কোর লস হচ্ছে এডি কারেন্ট (eddy current) লস এবং হিস্টেরিসিস লসের যোগফল। ইস্পাতের কোরকে ভালোভাবে স্তরায়িত করে এডি কারেন্ট লস কমানো যায়। এক্ষেত্রে প্রতিটা কোরের পুরুত্ব ৫০ সাইকেল ফ্রিকোয়েন্সির জন্য ০.৩৫ মিমি এবং ২৫ সাইকেল ফ্রিকোয়েন্সির জন্য ০.৫ মিমি হয়ে থাকে। ভালো ইস্পাত ব্যবহারের মাধ্যমে হিস্টেরিসিস

লসও কমানো যায়। এক্ষেত্রে শতকরা চার ভাগ সিলিকন মিশ্রণ ব্যবহারে ইস্পাতের permeability বৃদ্ধি পায়।

 

ইন্সুলেশন (Insulation): কয়েলের নিজেদের প্যাঁচের মধ্যে ইন্সুলেশন সুপার এনামেল আবরণের দ্বারাই হয়ে থাকে। তাছাড়া কয়েল তৈরীর সময় কিছু প্যাঁচ পর পর অ্যাম্পিয়াল ক্লথ বা লেদার ওয়েব পেপারও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কোরকে কয়েল হতে ইন্সুলেট করার জন্য কোরের উপর ইন্সুলেটিং পেপার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ ছাড়াও বড় বড় ট্রান্সফরমারের ক্ষেত্রে কোর ও কয়েলকে ইন্সুলেটিং তেলের মধ্যে ডুবিয়ে রেখে ইন্সুলেটিং শক্তি ব্যবহার করা হয়।

 

ট্যাংক (Tank): উইন্ডিংস এবং ট্রান্সফরমার কোর একটি ট্যাংকের মধ্যে তেলে ডুবানো থাকে। ইস্পাত দিয়ে ওয়েল্ডিং করে ট্যাংকটি তৈরী করা হয়। ট্যাংকের উপর জলবায়ু নিরোধক গ্যাসকেট লাগিয়ে তার উপর ঢাকনা দিয়ে লাগানো হয়। কোরকে শক্ত করে ট্যাংকের তলার সঙ্গে আটকানো হয়।

 

ট্রান্সফরমার ওয়েল (Transformer Oil): ট্যংকের মধ্যে যে তেল ভর্তি করা থাকে তাকেই ট্রান্সফরমার অয়েল বলা হয়। এটি মূলত ইন্সুলেটিং অয়েল। এর মূল কাজ ইন্সুলেশন এবং উইন্ডিংকে ঠান্ডা রাখা।

 

কনজারভেটর (Conservator): ট্রান্সফরমার তেল গরম হলে আয়তনে বাড়ে এবং ঠান্ডা হলে আয়তনে কমে যায়। বাড়া-কমার এই সমস্যা সমাধানের জন্য ট্যাংকের উপর একটি ড্রাম বসানো থাকে। এই ড্রামটিকে কনজারভেটর বলা হয়। এটি একটি পাইপের মধ্য দিয়ে ট্যাংকের সাথে সংযুক্ত থাকে। তেল গরম হয় আয়তনে বাড়লে পাইপের মধ্য দিয়ে কিছু তেল কনজারভেটরে চলে আসতে পারে। আবার তেল ঠান্ডা হয়ে সংকুচিত হলে কনজারভেটর থেকে কিছু তেল ট্যাংকে চলে নেমে আসে।

 

ব্রীদার (Breather): ট্যাংকে জলীয় বাষ্পমুক্ত শুষ্ক বাতাস প্রবেশ করানোর

জন্য যে পাত্র ব্যবহার করা হয় তাকে ব্রীদার বলে। এটা একটা কাঁচের পাত্র। তেল বাড়া কমার সাথে বাতাস আসা যাওয়ার জন্য কনজারভেটরের উপরের দিকে একটি পাইপ দিয়ে ব্রীদার যুক্ত করা থাকে। ব্রীদারের মধ্য সিলিকা জেল নামে এক প্রকার রাসায়নিক থাকে। সিলিকা জেলের মূল কাজ হলো ব্রীদারের মধ্য দিয়ে বাতাস আসা যাওয়ার সময় তা জলীয় বাষ্প শুষে নেয়।

 

বুশিং (Bushing): উইন্ডিং এর টার্মিনালগুলো বুশিং এর মাধ্যমে ট্রান্সফরমার ট্যাংকের বাইরে আনা হয়। এই বুশিং এর মাধ্যমে প্রাইমারী কয়েল ac উৎসের সাথে এবং সেকেন্ডারী কয়েল লোডের সাথে সংযুক্ত হয়। বুশিং দুই ধরনের হয় হাই সাইড বুশিং এবং লো সাইড বুশিং। হাই সাইড বুশিং এর আকার বড় হয় এবং লো সাইড বুশিং এর আকার ছোট হয়। তোমরা তো জানই ট্রান্সফরমারে মূল কাজ ভোল্টেজ মান পরিবর্তন করা। তাই প্রাইমারী ও সেকেন্ডারীতে ভোল্টেজের মান সমান থাকে না। ভোল্টেজের মানের সাথে সংগতি রেখেই পরিবহন তার যুক্ত করা হয়। নইলে দূর্ঘটনা ঘটবে। সে জন্যই হাই সাইড বুশিং ও লো সাইড বুশিং এর প্রয়োজন হয়। উচ্চ ভোল্টেজের উইন্ডিং হাই সাইডের সাথে অন্যটা লো সাইডের সাথে যুক্ত হবে।

 

বুখোলজ রীলে (Buchholz relay): এই রীলেটি ট্রান্সফরমার ট্যাংক কনজারভেটরের সংযোগকারী পাইপের মধ্যে লাগানো থাকে। ট্রান্সফরমারে কোন কারণে গ্যাস জমলে যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় সেই ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া তেলের গুণাগুণ নষ্ট হলেও এই রীলে সংকেত দেয়।

 

আর্থ পয়েন্ট (Earth Point): ট্রান্সফরমারের বডি গ্রাউন্ডিং করার জন্য দুইটি আর্থ পয়েন্ট থাকে। ঐ দুটি পয়েন্ট মাটির সাথে সংযুক্ত থাকে। এটি নানান দূর্ঘটনা থেকে ট্রান্সফরমারকে রক্ষা করে এমনকি বজ্রপাতের সময়ও ট্রান্সফরমারকে সেইভ করে।

থার্মোমিটার(Thermometer): ট্রান্সফরমার তেলের তাপমাত্রা মাপার জন্য একটি থার্মোমিটার বা টেম্পারেচার মাপার যন্ত্র থাকে। এর পরিমাপকারী দন্ডটি ট্রান্সফরমারের ভেতরে একটি তেলভর্তি প্যাকেটের সাথে সংযুক্ত থাকে।

 

 

ট্রান্সফরমার কিভাবে কাজ করেঃ

 

ট্রান্সফরমারের এক বা একাধিক কয়েলে যখন এসি পাওয়ার ইনপুট দেয়া হয়, তখন কয়েল এবং আয়রণ কোরের চতুর্দিকে ম্যাগনেটিক ফ্লাক্স উৎপন্ন হয়, যার কারণে অন্যান্য কয়েলে আবেশিত কারেন্টের সৃষ্টি হয়। যে কয়েলগুলোতে পাওয়ার ইনপুট দেয়া হয়, সেগুলো প্রাইমারি। এবং যেগুলো থেকে পাওয়ার আউটপুট নেয়া হয় সেগুলো সেকেন্ডারি হিসেবে পরিচিত। এই সেকেন্ডারি কয়েলে উৎপন্ন ভোল্টেজ প্রাইমারি বা সাপ্লাই ভোল্টেজের থেকে বেশি (স্টেপ আপ ট্রান্সফরমার) বা কম (স্টেপ ডাউন) হতে পারে। মূলত কাজের ধরণ হিসেবে এই ট্রান্সফরমারের প্রকার এমন ২ ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রত্যেক কয়েলে তারের টার্ন বা প্যাচের সংখ্যা ট্রান্সফরমারের কোরের সাইজের সাথে ব্যাস্তানুপাতিক ভাবে পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ কোর মোটা হলে তারের প্যাচ বা টার্ন সংখ্যা কমে, আর কোর চিকন হলে প্যাচ বাড়ে।

 

ট্রান্সফরমারের রেশিওঃ  

 

ট্রান্সফরমারেরপ্রাইমারিওসেকেন্ডারিকয়েলেরভোল্টেজ, প্যাঁচসংখ্যাওকারেন্টেরমধ্যেযেসম্পর্কথাকে, তাকেট্রান্সফরমারেরট্রান্সফরমেশনরেশিওবলে।একেনিম্নোক্তভাবেপ্রকাশকরাযায়-

VpVs = NpNs = IsIp

এখানে,

Vp প্রাইমারীভোল্টেজ

Vs = সেকেন্ডারীভোল্টেজ

Np = প্রাইমারীপ্যাঁচসংখ্যা

Ns = সেকেন্ডারীপ্যাঁচসংখ্যা

Ip = প্রাইমারীকারেন্ট

Is = সেকেন্ডারীকারেন্ট

নিচেরচিত্রটিলক্ষ্যকরলেবুঝতেসুবিধাহবেআশাকরি-

 

ট্রান্সফরমারের লসঃ

 

ট্রান্সফরমারের লস দুই প্রকার যথাঃ

 

১। এডি কারেন্ট লস

ট্রান্সফরমারেরআয়রনলসটানির্ভরকরেম্যাক্সিমামফ্লাক্সঘনত্বআরসাপ্লাইফ্রিকোয়েন্সিএরউপর।যেহেতুট্রান্সফরমারসবসময়নির্দিষ্টঅর্থাৎফিক্সডফ্রিকোয়েন্সিআরসাপ্লাইওফিক্সডতাহলেএখানেকোরওআয়রনলসপ্র্যাক্টিক্যালযেকোনলোডেরজন্যইসমানহয়।অর্থাৎএখানেআয়রন/কোরলসকন্সট্যান্টবাঅপরিবর্তিতলসহিসেবেগণ্যহয়।আরএটিইমুলতএডিকারেন্টলসনামেপরিচিত।

 

২।হিস্টেরেসিস লসঃ

আমরাজানিট্রান্সফরমারতৈরিহচ্ছেতড়িৎচৌম্বকীয় বস্তুযেমনলোহা, ফেরাইটকোরপ্রভৃতিদ্বারা।এখনএইট্রান্সফরমারযখনকোনঅল্টারনেটিংকারেন্টের দ্বারাবারবার ম্যাগনেটাইজ ও ডিম্যাগনেটাইজ করাহয়তখনএরঅভ্যন্তরেথাকা অণু বা কোরম্যাটেরিয়াল গুলোবারংবারদিকপরিবর্তনকরতেথাকে।এইদিকপরিবর্তনেরফলেকিছুশক্তিতাপহিসাবেনির্গতহয়যাকোনকাজেলাগেনা।একেইহিসটেরেসিসলসবলে।

এখানেউল্লেখ্যযেএইহিসটেরেসিসলসশুধুযেট্রান্সফরমারেইহয়তাকিন্তুনয়। মোটর, জেনারেটর, ফ্যান থেকেশুরুকরেযেখানেইকোনকয়েলকেচৌম্বকীয়বস্তুরউপরপ্যাঁচানোহয়সেখানেই হিস্টেরেসিসলস দেখাযায়।তবে জেনারেটরআরট্রান্সফরমারএএইহিস্টেরেসিসলসটিবেশিনিয়ন্ত্রণেরচেষ্টাকরাহয়